শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

আওয়ামী আমলে পাওয়ার সেক্টর

পতিত আওয়ামী সরকারের আমলে দেশের বিদ্যুৎ সেক্টরকে দুর্নীতি ও হরিলুটের অভয়ারণ্যে পরিণত করা হয়েছে। কথিত কুইক রেন্টালের নামে রাষ্ট্রে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ কারোরই অজানা নয়। আর আদানির বিদ্যুৎ নিয়ে শুল্ক ফাঁকি ও পদে পদে অনিয়মের অভিযোগ ছিল খুবই গুরুতর। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা অতি সতর্কতার সাথে অগ্রসর হয়েছে। তবে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে থলের বিড়াল। সম্প্রতি শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ আমদানিতে এক বছরে অন্তত ৩৯ কোটি à§­à§© লাখ à§­à§§ হাজার ৪৬৭ মার্কিন ডলার শুল্ক ‘ফাঁকির’ প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিদ্যুৎ কেনার এ চুক্তির সময় সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে পাশ কাটিয়ে দেওয়া হয়েছে শুল্ক ও কর অব্যাহতি। এছাড়া আমদানি করা বিদ্যুতের তথ্য যুক্ত করা হয়নি অ্যাস্যাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম ও কাস্টমসের এমআইএস-এ। 

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ৫ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর অধীন সম্পাদিত চুক্তিগুলো পর্যালোচনায় একটি জাতীয় কমিটিও গঠন করেছে। যেখানে আদানি পাওয়ারসহ বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ সংক্রান্ত ১১টি চুক্তি খতিয়ে দেখা হবে। যার মধ্যে আদানি পাওয়ারের নির্মিত প্রায় ১৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন গোড্ডা পাওয়ার প্ল্যান্টও রয়েছে।

২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত আদানির কেন্দ্র থেকে ১০৫৮ কোটি ৮৯ লাখ ৯০ হাজার ৮৪ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করেছে বাংলাদেশ। যার মূল্য ১২৮ কোটি ১৮ লাখ ৪৩ হাজার ৪৪২ ডলার। এর বিপরীতে ৩১ শতাংশ আমদানি শুল্ক ও বিভিন্ন কর মিলে ৩৯ কোটি ৭৩ লাখ ৭১ হাজার ৪৬৭ ডলারের শুল্ক-কর পাওয়ার কথা। অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের শীর্ষ শিল্পপতি গৌতম আদানির মালিকানাধীন বহুজাতিক কোম্পানি আদানি গ্রুপের কাছ থেকে বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনেছে।

গত ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের আদানি গ্রুপের কাছ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তিতে শুল্ক সংক্রান্ত বিষয়গুলো কীভাবে সম্পাদন করা হয়েছে, এতে কোনো ত্রুটি ছিল কি না, শুল্ক পরিহার বা প্রত্যাহারের বিষয় রয়েছে কি না; এসব প্রশ্ন সামনে রেখে তদন্ত শুরু করে শুল্ক গোয়েন্দারা। প্রতিবেদনে কর ফাঁকির এই অর্থ পিডিবির কাছ থেকে আদায়ের সুপারিশ করেছে শুল্ক গোয়েন্দাদের এ কমিটি। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সাল থেকেই আমদানি করা এ বিদ্যুতের শুল্কসহ অন্যান্য কর পরিশোধ করা হয়নি। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিদ্যুৎ প্রবেশ ও সঞ্চালনের সময় আমদানির যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেনি।

২৫ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় এনবিআর ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই আদানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে শুল্ক অব্যাহতি দিয়েছে পিডিবি। যদিও কর, শুল্ক ও ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়ার এখতিয়ার শুধুই রাজস্ব বোর্ডের। চুক্তির আওতায়, ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত আদানির কেন্দ্র থেকে ১০৫৮ কোটি ৮৯ লাখ ৯০ হাজার ৮৪ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করেছে বাংলাদেশ। যার মূল্য ১২৮ কোটি ১৮ লাখ ৪৩ হাজার ৪৪২ ডলার। এর বিপরীতে ৩১ শতাংশ আমদানি শুল্ক ও বিভিন্ন কর মিলে ৩৯ কোটি ৭৩ লাখ ৭১ হাজার ৪৬৭ ডলারের শুল্ক-কর পাওয়ার কথা।

কোন প্রক্রিয়ায় এবং কোন শুল্ক স্টেশন বা হাউজ দিয়ে আদানির বিদ্যুৎ আমদানি হয়েছে তারও খোঁজ নিয়ে কমিটি দেখতে পায়, এ যাবত ‘কোনো বিল অব এন্ট্রি দাখিল এবং তা আইনানুগ পন্থায় নিষ্পত্তি হয়নি’। প্রতিবেদনে বলা হয়, যে রুট (রহনপুর শুল্ক স্টেশন, রাজশাহী) দিয়ে আদানির বিদ্যুৎ বাংলাদেশে প্রবেশ ও সঞ্চালন করা হচ্ছে, তা কাস্টমস আইন, ১৯৬৯ বা কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর আওতায় ‘কাস্টমস স্টেশন হিসেবে অনুমোদিত বা ঘোষিত স্থান নয়’। যে রুট ব্যবহার করে আদানির বিদ্যুৎ বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালন করা হচ্ছে, ওই স্থানকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর আওতায় কাস্টমস স্টেশন হিসেবে ঘোষণা করার পরামর্শ দেওয়া হয় প্রতিবেদনে। এছাড়া অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম যাচাই করে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে বিল অব এন্ট্রি দাখিল না করার প্রমাণ পায় এনবিআর। বিদ্যুতের শুল্কায়ন সংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করতে রাজস্ব বোর্ডের কোনো দপ্তরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে।

সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেহেতু বিদ্যুৎ অন্যবিধ কোনো পণ্যের অনুরূপ নয়; ফলে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে কোন প্রক্রিয়ায় বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হবে তা নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিতে পারে। এনবিআরের আদেশ না থাকা সত্ত্বেও শুল্ক-কর পরিশোধ না করে আদানির বিদ্যুৎ আমদানি করায় যে শুল্ক-কর ফাঁকির ঘটনা ঘটেছে পিডিবি এর দায় এড়াতে পারে না। এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে প্রযোজ্য শুল্ক-কর পরিশোধের নির্দেশনা এবং কাস্টমস আইন অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ভারতের বহুজাতিক শিল্পগোষ্ঠী আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তিতে নিয়ে বড় ধরনের পুকুর চুরির অভিযোগ রয়েছে শুরু থেকেই। এমনকি প্রচলিত বাজার মূল্যের চেয়ে অধিক মূল্যে বিদ্যুৎ কেনার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে বড় ধরনের শুল্কফাঁকি ও পদে পদে অনিয়মেরও। মূলত, আওয়ামী-বাকশালী আমলে পুরো পাওয়ার সেক্টর দুর্নীতি ও লুটপাটের স্বর্গরাজ্য। তাই এখন সময় এসেছে আদানি গ্রুপের সাথে সকল চুক্তির বিষয় পুনর্বিবেচনা করার। অন্যথায় আমাদের কোন অর্জনই ফলদায়ক হবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ